হে আমার মুসলিম ভাই' বইটির পর্যালোচনা: ইসলামের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা ও দাওয়াতের পথ
বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আরব মনীষী এবং প্রখ্যাত আলেম ড. আলী তানতাবীর (১৯০৯-১৯৯৯) কালজয়ী রচনা 'মান হুওয়াল মুসলিম' এর চমৎকার বাংলা অনুবাদ হলো 'হে আমার মুসলিম ভাই'। সিরিয়ার এক ঐতিহ্যবাহী আলেম পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মনীষী একাধারে শিক্ষক, বিচারক, তুখোড় বক্তা এবং দক্ষ লেখক ছিলেন। ১৯৩১ সালে শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও সত্য কথন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার কারণে তাকে বিভিন্ন সময় কারাবরণ ও দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছিল। তার এই ক্ষুদ্র কিন্তু সমৃদ্ধ গ্রন্থটিতে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস থেকে শুরু করে আধুনিক দাওয়াতের পদ্ধতি পর্যন্ত অত্যন্ত সাবলীলভাবে ফুটে উঠেছে।
ইসলামের মূল ভিত্তি ও প্রকৃত মুসলিমের পরিচয়
বইটির শুরুতেই ড. আলী তানতাবী একজন প্রকৃত মুসলিমের স্বরূপ বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর মতে, ইসলাম তিনটি বিষয়ের সমষ্টি: ধর্মের বিধি-নিষেধ সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জন, সেগুলোকে অন্তরের গভীর থেকে বিশ্বাস করা এবং তা কর্মে বাস্তবায়ন করা। যখন সমাজে জাহিলিয়্যাতের ঘোর অন্ধকার ছিল, তখন আল্লাহ তাআলা নবী মুহাম্মাদ (সা.)-কে সর্বজনীন ও সর্বকালীন শরীয়ত দিয়ে পাঠিয়েছেন। লেখক দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেছেন যে, নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর মাধ্যমেই নবুয়তের ধারা শেষ হয়েছে এবং কুরআন ও সুন্নাহই হলো ইসলামের মূল স্তম্ভ।
ইসলাম: একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা
ড. আলী তানতাবী এই বইয়ে স্পষ্ট করেছেন যে, ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের নাম নয়, বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং চারিত্রিক বিধান। তিনি আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ ধারণার সমালোচনা করে বলেন যে, রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি-বিধানকে ইসলাম থেকে আলাদা করার কোনো সুযোগ নেই। ইসলামের দৃষ্টিতে দুনিয়ার প্রতিটি কাজ পাঁচটি নীতির (ফরজ, সুন্নাত/মুস্তাহাব, মুবাহ, মাকরুহ এবং হারাম) আওতাভুক্ত। লেখক জোর দিয়ে বলেছেন যে, ইসলামের বিধান রোমান সমাজব্যবস্থার চেয়েও অনেক বেশি সমৃদ্ধ ও পরিপুষ্ট।
দাওয়াতের ছয়টি পদ্ধতি
এই বইটির অন্যতম আকর্ষণীয় অংশ হলো ইসলামী দাওয়াতের বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে লেখকের গবেষণা। তিনি মুজাদ্দিদ ও দায়ীগণের দাওয়াতের পদ্ধতিকে ছয়টি প্রধান ধারায় বিভক্ত করেছেন:
- শাসকদের দাওয়াত দেওয়া: এই পদ্ধতিতে সরাসরি রাজা বা শাসকদের ইসলামের প্রতি আগ্রহী করে তোলা হয়। মুজাদ্দিদে আলফে সানী আহমাদ সিরহিন্দী (রহ.) এই পদ্ধতি অবলম্বন করে মুঘল সম্রাট আকবরের 'দ্বীনে ইলাহী'র বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন।
- শাসকের পৃষ্ঠপোষকতায় দাওয়াত: শাসক যখন দাওয়াতের কাজে সাহায্য করেন, যেমন নজদে মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাব (রহ.)-এর দাওয়াত।
- সংগ্রামের মাধ্যমে শাসন কায়েম: সাইয়েদ আহমাদ ইবনে ইরফান শহীদ (রহ.) এবং ফিলিস্তীনের ইযযুদ্দীন কাসসাম (রহ.) এই সশস্ত্র সংগ্রামের পথ দেখিয়ে গেছেন।
- সভা ও প্রচারণার মাধ্যমে দাওয়াত: জামালুদ্দিন আফগানী ও তাহের আল জাযায়িরীর মতো মনীষীরা সভা-সেমিনার ও আলোচনার মাধ্যমে মানুষের সামনে ইসলামের গুরুত্ব তুলে ধরতেন।
- শিক্ষা ও লেখনীর মাধ্যমে দাওয়াত: শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবী (রহ.) এবং শায়খ রশীদ রেজা প্রমুখ এই জ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতির পথিকৃৎ।
- সংবাদ মাধ্যম ও সাহিত্য: পত্র-পত্রিকা ও বক্তৃতার মাধ্যমে দাওয়াতের এই ধারাটি মুহিববুদ্দীন আল খতীব এবং শায়খ শাকিব আরসালান জনপ্রিয় করেন।
ইসলামী আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য ও লেখকের বিশ্লেষণ
ড. আলী তানতাবী তাঁর সমসাময়িক ইসলামী দলগুলোর কর্মপন্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। বিশেষ করে জামাতে তাবলীগ এবং আরও একটি প্রধান সংগঠনের গঠনতন্ত্র বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে একটি সার্থক সংগঠনে সুফী তত্ত্ব (ইমাম গাজালীর পন্থায়), সালাফী মতবাদ (ইবনে তাইমিয়ার আদর্শে) এবং ইসলাম ও আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সংমিশ্রণ থাকা প্রয়োজন। তবে তিনি এই মতবাদগুলোর ভারসাম্যহীনতা সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।
উপসংহার
বইটি শেষ হয়েছে একজন আদর্শ ইসলামী নেতার গুণাবলী বর্ণনার মাধ্যমে, যা মূলত একজন মুসলিম ভাইয়ের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। বিনয়, মেধা, ত্যাগ এবং বিরল বক্তৃতাশৈলীর অধিকারী ড. আলী তানতাবীর এই লেখাটি বর্তমান যুগের মুসলিমদের জন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে। যারা সংক্ষেপে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ রূপ ও দাওয়াতি ময়দানের ইতিহাস জানতে চান, তাদের জন্য এই বইটি পাঠ করা অত্যন্ত জরুরি।
FAQ (সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী)
১. 'হে আমার মুসলিম ভাই' বইটির মূল লেখক কে?
উত্তর: বইটির মূল লেখক বিংশ শতাব্দীর প্রখ্যাত আরব মনীষী ও বিচারক ড. আলী তানতাবী।
২. বইটির মূল বিষয়বস্তু কী?
উত্তর: বইটিতে একজন প্রকৃত মুসলিমের দায়িত্ব, ইসলামের পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে পরিচয় এবং দাওয়াতের বিভিন্ন পদ্ধতি ও আধুনিক ইসলামী আন্দোলনগুলোর বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
৩. লেখক দাওয়াতের কয়টি পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেছেন?
উত্তর: লেখক দাওয়াতের প্রধান ছয়টি পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেছেন, যার মধ্যে শাসকের মাধ্যমে সংশোধন, শিক্ষা, লেখনী এবং সংগ্রামের পথ অন্যতম।
৪. ইসলাম ও রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে লেখকের মতামত কী?
উত্তর: লেখক স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে রাজনীতি ইসলামেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং কুরআন ও সুন্নাহ থেকে একে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়।
৫. বইটিতে কোন কোন মনীষীর দাওয়াতের পদ্ধতির উদাহরণ দেওয়া হয়েছে?
উত্তর: মুজাদ্দিদে আলফে সানী, মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাব, সাইয়েদ আহমাদ শহীদ, শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবী এবং জামালুদ্দিন আফগানীর মতো মহান ব্যক্তিদের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে।
